ঘাটাইলে সামাজিক বনায়নে ব্যাপক অনিয়ম

0 9

ঘাটাইল প্রতিনিধি:

টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীদের প্লট বরাদ্দে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভূমিহীন, দুস্থ নারী, পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠি, দরিদ্র আদিবাসী ও অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের এসব প্লট বরাদ্দ দেওয়ার কথা থাকলেও বন বিভাগের কর্মকর্তারা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক ও সরকারি কর্মকর্তাদের নামে প্লট বরাদ্দ দিয়েছেন। সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এমনকি ষষ্ঠ শ্রেণি পড়ূয়া শিক্ষার্থীর নামও রয়েছে প্লট বরাদ্দপ্রাপ্তদের তালিকায়। নিয়ম লঙ্ঘন করে অন্য উপজেলার লোকদেরও দেওয়া হয়েছে প্লট। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে প্লট বরাদ্দের নানা অসঙ্গতির চিত্র। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সৃজন করা একটি বিটের প্লট প্রাপ্তির মাত্র ৫০ জনের তালিকা ধরে চালানো অনুসন্ধানে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। উপজেলার ধলাপাড়া রেঞ্জ অফিস জানায়, আগের সামাজিক বনায়নের বাগানের মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর ২০১৭-১৮, ২০১৮-১৯ এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে নতুন করে বাগান সৃজন করা হয়। প্রতি প্লটের আয়তন ৬২ শতাংশ। সামাজিক বনায়নের অংশ হিসেবে ১০ বছর মেয়াদে বাগান সৃজন করে বন বিভাগ। নীতিমালা অনুসারে প্লট বরাদ্দ পাওয়ার কথা দরিদ্রের। প্লট পাওয়া লোকদের বলা হয় উপকারভোগী। বরাদ্দকৃত প্লট দেখভাল করে মেয়াদ শেষে নিলামে গাছ বিক্রির মোট টাকার ৬০ ভাগ পাবেন ওই উপকারভোগীরা। বাকি ৪০ ভাগ পাবে বন বিভাগ। ২০১০ সালের ১১ জানুয়ারি বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় ২০০৪ সালে করা সামাজিক বনায়নের বিধিমালা সংশোধন করে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। সেখানে বিধি ৬ এর (খ) উপ-বিধিতে বলা আছে, সাধারণভাবে কোনো সামাজিক বনায়ন এলাকার এক বর্গকিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্য থেকে ওই এলাকার উপকারভোগী নির্বাচিত হবেন। যে শ্রেণির লোক নির্বাচিত হবেন তারা হলেন ভূমিহীন, ৫০ শতাংশের কম ভূমির মালিক, দুস্থ নারী, অনগ্রসর গোষ্ঠী, দরিদ্র আদিবাসী, অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা অথবা মুক্তিযোদ্ধার অসচ্ছল সন্তান।
কিন্তু ঘাটাইলে সে তালিকায় কিছুসংখ্যক প্লট ওই শ্রেণির লোক বরাদ্দ পেলেও বেশিরভাগই পেয়েছেন ধনাঢ্যরা। উপজেলার ধলাপাড়া রেঞ্জের আওতায় বিট অফিস রয়েছে ৬টি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সৃজন করা ঝড়কা বিটের বাগানে তালিকায় ২১৯ নম্বরে উপকারভোগী হিসেবে নাম রয়েছে মো. সবুর উদ্দিনের। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিনি সোনালী ব্যাংকের জিএম পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেছেন। একই তালিকায় ২২০ নম্বরে নাম রয়েছে সবুর উদ্দিনের স্ত্রী খন্দকার সামসুন নাহারের। তিনি তেজগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের গণিত বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। দু’জনেই থাকেন ঢাকায়। সবুর উদ্দিন জানান, তিনি ও তার স্ত্রী আবেদন করেছিলেন। প্লট পাওয়ার কথা শুনেছেন। বরাদ্দপত্রের কপি তার শ্যালকের কাছে রয়েছে। ঢাকায় থাকার কারণে প্লটে এখনও কোনো কাজ করতে পারেননি। একই অর্থবছর ও একই বিটের প্লট বরাদ্দের তালিকায় ২০৯ নম্বরে নাম আছে ফারদিনা রহমান ঊর্মিলার। পড়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে। ঊর্মিলার বাবা-মা, চাচা-চাচি, চাচাতো ভাই এমনকি ফুপু- ফুপাদের নামেও প্লট রয়েছে। তার চাচাদের রয়েছে পাঁচ ছয় তলা করে দালান। ফুপা-ফুপুও চাকরি করেন। ঊর্মিলার বাবা ফরহাদ রহমান ও মা সামিমা নাসরিন দু’জনেই চাকরি করেন ঘাটাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। ঊর্মিলার আরেক চাচা মোহাম্মদ ফরিদ রহমান কর্মরত বাংলাদেশ আনসার ব্যাটালিয়নের সহকারী পরিচালক হিসেবে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলায়। তালিকায় ১৮৭ নম্বরে তারও নাম রয়েছে। বাদ যাননি ফরিদ রহমানের স্ত্রী কোহিনুরও। তিনি কর্মরত ঘাটাইলের রতনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ধলাপাড়া রেঞ্জ কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম বলেন, প্রায় ২০ দিন হলো যোগদান করেছি। এসব বিষয়ে আগের কর্মকর্তা বলতে পারবেন। ধলাপাড়া রেঞ্জের সাবেক কর্মকর্তা বর্তমানে মধুপুরে কর্মরত এসএম হাবিবুল্লাহ বলেন, যারা বরাদ্দ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখল করছে তাদেরই পুনরায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তাদের উচ্ছেদ করে গরিব অসহায় অসচ্ছল লোকদের বরাদ্দ দিলেই বনায়ন কর্মসূচি সফল হবে না। এ ছাড়া প্লট বরাদ্দ দেন বিট কর্মকর্তা। তারাই আবেদনকারীর আবেদনপত্র যাচাই-বাছাই করেন। কোনো সমস্যা থাকলে দায় তাদের। টাঙ্গাইলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ জহিরুল হক বলেন, আইনের মধ্যে থেকেই প্লট বরাদ্দ দেওয়ার কথা। নিয়মবহির্ভূত কাউকে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হলে তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave A Reply

Your email address will not be published.