কালিহাতির ঐতিহ্যবাহী নৌকার হাটে মন্দাভাব \ পেশা বদলের কথা ভাবছেন কারিগররা

0 0

কালিহাতি প্রতিনিধিঃ

‘‘আমার নৌকা ভাসাইয়া জলে, চেয়ে থাকি বসি তীরে/ ছোট ছোট ঢেউ উঠে আর পড়ে, রবির কিরণে ঝিকিমিকি করে…” কবিগুরুর এই ছন্দের মিল খুঁজে পাওয়া যায় আবহমান চিরায়ত গ্রামবাংলার ঐতিহ্য পালতোলা নৌকার বৈচিত্রতায়।
এখন হয়তো কবির ছন্দের মতো পালতোলা নৌকা খুব একটা দেখা মেলে না। কিন্তু বর্ষা এলেই নৌকার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় গ্রাম্য এলাকার প্রায় প্রতিটি ঘরে। ফলে বিনোদনের জন্য না হলেও প্রয়োজনের তাগিদেই মানুষ নৌকাকে আকড়ে আছে সৃষ্টির ঊষালগ্ন থেকেই।

টাঙ্গাইলে অসংখ্য নদী, খাল, বীল, জলাভূমি রয়েছে। বর্ষাকালের দুই মাস আষাঢ়-শ্রাবণ ছাড়াও বছরের অধিকাংশ সময় নি¤œাঞ্চল এলাকায় পানি থাকে। ফলে এখানে নৌকার প্রয়োজনীয়তা বেশি। এখানে মূলত; যাতায়াতের কাজ ছাড়াও মাছ ধরা, খেয়া পারাপার, পণ্য পরিবহন, বিনোদন ও কৃষি কাজের জন্য নৌকার অপরিহার্যতা বেশি।

টাঙ্গাইলে যে কয়টি নৌকা তৈরি ও বিক্রির হাট-বাজার রয়েছে তার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হচ্ছে কালিহাতি উপজেলার রামপুর পুরাতন বাজারের এতিহ্যবাহী নৌকার হাট। প্রতি বছর এই মওসুমে স্থানীয় ও বিভিন্ন এলাকার নৌকার কারিগর তাদের তৈরি বাহারি নৌকা নিয়ে আসে এই হাটে। একই সাথে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে ক্রেতারা আসেন তাদের পছন্দমতো নৌকা কিনতে। কেনা-বেচা শেষে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যান। এভাবেই চলতে থাকে পুরো বর্ষা মওসুম। অপরদিকে এখানকার নৌকার গুনগত মান ও বাহারি ডিজাইনের হওয়ায় নৌকার চাহিদাও থাকে বেশি। কারিগররাও চাহিদা পূরণে দিন-রাত ব্যস্ত থাকে। যেন দম ফেলার সময় নেই।

গত শুক্রবার সরেজমিন ওই নৌকার হাটে গিয়ে দেখা যায়, হাটের ঘাটে থরে থরে সাজানো নৌকার পসরা থাকলেও নৌকা কিনতে ক্রেতার উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো নয়। সবাই নিজ পছন্দমতো প্রয়োজনীয় নৌকাটি কিনছেন অনায়াসে। দেরি হলে যুৎসই নৌকাটি হাতছাড়া হয়ে যাবার শংকা বা প্রতিযোগিতা নেই। সেখানে কথা হয় নৌকার ক্রেতা-বিক্রেতার সাথে।
মহিষজোড়া এলাকা থেকে নৌকা বিক্রি করতে আসা রতন, রিপন সূত্রধর ও অতুল সরকারসহ আরও কয়েকজন জানান, তারা ১৯টি নৌকা বিক্রি করতে এনেছিলো। তাদের সবগুলো নৌকা অনেক বেশি সময় পর বিক্রি হয়েছে। তবে, মোটামুটি আশানুরুপ দাম পেয়েছেন বলেও জানান তারা।
বাসাইল উপজেলা থেকে আসা ক্রেতা জামাল হোসেন বলেন, মাছ ধরার জন্য প্রায় সাড়ে সাত হাজার টাকা দিয়ে একটি কোষা নৌকা কিনলাম। দাম নিয়ে তার কোন অভিযোগ নেই। নৌকাটি তার পছন্দমতো হয়েছে বলে বেশ উচ্ছ¡াস প্রকাশ করলেন।

হাটের ইজারাদার আবুল হোসেন বলেন, আজ ৩০টি নৌকা বিক্রি হয়েছে। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নৌকার প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে নৌকার ক্রয়-বিক্রয় জমে উঠে। সপ্তাহের দুদিন (মঙ্গল ও শুক্রবার) এখানে হাট বসলেও শুধুমাত্র শুক্রবারের হাটে নৌকা বেচাকেনা চলে। এখানে ময়থা, ফুলকি, ঝনঝনিয়া, বাসাইল, তিরঞ্জ, মিরিকপুর, কাউলজানি, মান্দারজানি, গান্ধিনা, রতনগঞ্জ, বল্লা, পোষনা, পৌজান, সোমজানি, খরশিলা এলাকা থেকে বেশি ক্রেতা-বিক্রেতা আসে। আগে কালিহাতি ছাড়াও বাসাইল, মির্জাপুর, সখীপুর ও ঘাটাইল উপজেলার মানুষ নৌকা ক্রয়-বিক্রয় করতে আসতো। বিভিন্ন এলাকায় কারখানা গড়ে উঠায় এই হাটে ক্রেতা-বিক্রেতাও কমে গেছে। এবার করোনার কারনে ক্রেতা-বিক্রেতা আরও কম।

নৌকার কারিগরদের সাথে কথা বলে জানা যায়, উপজেলার কোকডহরা, বলধি, সাভার, বাড্ডা, মহিষজোড়া, রামপুর, পাইকড়াসহ বিভিন্ন এলাকার কারিগররা তাদের তৈরি নৌকা নিয়ে হাটে আসেন। একসময় সাম্পান, গয়না, ছিপ, বজরা, ময়ূরপঙ্খী, পিঙ্গিস, পানসি নৌকা গুলো ছিলো রাজা-বাদশা আর সৌখিন মানুষের বিনোদনের উৎস। কালের বিবর্তনে এগুলো এখন বিলুপ্তপ্রায়। প্রয়োজন ভেদে এখন শুধু ডিঙ্গি আর কোষা নৌকার চাহিদাই বেশি।

রামপুর বাজারে নৌকা তৈরীতে ব্যস্ত কারিগর উজ্জল, পথিক, ভাষাণ সূত্রধরের সাথে কথা বলে জানা যায়, মান ভেদে ১৪-১৫ হাত আকারের একটি নৌকা ১০ থেকে ১৩ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। মাঝারি আকারের ১২-১৩ হাত নৌকা আট থেকে নয় হাজার টাকা ও ছোট আকারের ৯-১১ হাত মাপের নৌকা ছয় থেকে আট হাজার টাকায় বিক্রি হয়ে থাকে। পাহাড়ি এলাকার গজারি কাঠের নৌকার দাম ও চাহিদা বেশি। তবে আম গাছ, কাঠাঁল গাছ ও শিমুল গাছের কাঁঠ দিয়ে তৈরি নৌকার চাহিদাও উল্লেখযোগ্য।

রহিজ উদ্দিন, সুবল, সজীবসহ কয়েকজন বলেন, লোহা, কাঠসহ অন্যান্য উপকরণের খরচ বাদে মজুরী পেলেই নৌকা বিক্রি করে থাকি।
সুমন, নেপাল, সন্তোষ বলেন, অন্য বছর বিপুল পরিমাণ ক্রেতা নৌকা কিনতে আসলেও এবার করোনার কারনে খুব একটা ক্রেতা আসছে না। এভাবে ক্রেতা কমতে থাকলে হয়তো আমাদেরকে পেশা বদল করতে হবে।

Leave A Reply

Your email address will not be published.